উৎপাদনে সৌরবিদ্যুত জমির বিকল্প হতে পারে রেললাইন

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম সংকট হচ্ছে জমির স্বল্পতা। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জমির বিকল্প হতে পারে দেশজুড়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের যে রেললাইন রয়েছে তার দুই পাশের ও দুই লাইনের মাঝের জায়গা। রেলের লিজে থাকা অনেক জমি এবং জবরদখলকৃত জমিও হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি স্থান। বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেলের দুই লাইনের পাশের জমি এবং নতুন ব্রডগেজ যে রেললাইন তৈরি করা হয়েছে তার মাঝে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে বিস্তারিত আলোচনা

করলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও বিষয়টিতে আগ্রহী হবে। আবার এর মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, রেলওয়ের লাইন সুরক্ষার পাশাপাশি জননিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে বলে তাঁরা মন্তব্য করেন। বিশ্বে প্রথমবারের মতো রেললাইনের মাঝে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ড। রেললাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশটি তার বিদ্যুতের এরপর পৃষ্ঠা ২ কলাম ৬[পেছনের পৃষ্ঠার পর] চাহিদা পূরণ করতে যাচ্ছে। এমন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে সুইস এনার্জি স্টার্টআপ সান ওয়েস। সুইজারল্যান্ডের রেললাইনের মাঝের ফাঁকা জায়গায় বসানো হচ্ছে সোলার প্যানেল। এ উদ্যোগ এরই মধ্যে গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে। এর মাধ্যমে রেলপথ হয়ে উঠছে সৌরশক্তি উৎপাদনের বিশাল উৎস। সুইজারল্যান্ডের ফেডারেল ট্রান্সপোর্ট অফিস থেকে এরই মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি মিলেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। ১ মিটার চওড়াবিশেষ সোলার প্যানেলগুলো রেললাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় বসানো হবে। সান ওয়েসের তৈরি বিশেষ ট্রেনের – মাধ্যমে এগুলো বসানো হবে। প্রথম ধাপে ৪৮টি প্যানেল বসানো হবে। এ প্যানেলগুলোর প্রতিটির ক্ষমতা ৩৮০ ওয়াট। সব মিলিয়ে এ প্যানেলগুলো ৪ থেকে ১৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এ বিদ্যুৎ ■ পাওয়ার গ্রিডে পাঠিয়ে আবাসিক কাজেও ব্যবহার করা হবে। সাধারণত বড় জায়গার অভাবে জনবহুল দেশগুলোয় সোলার প্যানেল বসানো কষ্টসাধ্য। কিন্তু রেলের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করলে পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এতে কৃষিজমিরও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম। সুইজারল্যান্ডের ৫ হাজার ৩২৩ কিমি রেলপথের বেশির ভাগ অংশেই পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া যায়। সান ওয়েসের হিসাবে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বছরে ১ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব; যা দেশটির মোট বিদ্যুতের ২ শতাংশ। এ প্রকল্পের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সান ওয়েসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্যাপটিস্ট ড্যানিশার্ট জানান, বিশ্বের বিভিন্ন অংশেও তাঁরা এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে চান। তবে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব রেলওয়েজ জানিয়েছে, এ প্যানেল কখনো কখনো রেললাইনে ক্ষুদ্র ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। এতে বনে আগুন লাগার ঝুঁকি আছে। এ ছাড়া সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে রেলচালকের অসুবিধা হতে পারে। কিন্তু সান ওয়েসের দাবি, তাদের = প্যানেলগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে সূর্যের
আলো প্রতিফলিত হবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কিমি। আর সুইজারল্যান্ডের এ সোলার প্যানেল প্রযুক্তি যদি বাংলাদেশের রেলপথে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে। প্রতিবেশী দেশ থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজন আর পড়বে না। তারা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আবাদযোগ্য জমি সোলার প্যানেল দিয়ে ছেয়ে ফেলা ঠিক নয়। এ ছাড়া জমির সংকট কাটাতে বিভিন্ন নৌবন্দর, বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্টে খালি পড়ে থাকা অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তারা। জ্বালানি খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মো. জাকির হোসেন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, ‘আবার দেশে এমন জায়গায় ট্রেনের লাইন আছে যেখানে কোনো সড়ক পারে না। যেতে এমন জায়গার কমিউনিটিগুলোয় কমপক্ষে যদি ট্রেনের দুই পাশে যে জায়গা আছে সেখানে সোলার প্যানেল লাগানো হয় তাহলে সেই কমিউনিটিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। আবার গ্রামাঞ্চলে যেসব জায়গায় লোডশেডিং হয় সেখানেও এসব জায়গায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। আবার রেলের অনেক জমি লিজ দেওয়া আছে সেখানেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। সাধারণত রেলের জমি অপদখল হয়ে যায়। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে এসব জায়গার সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে। সমস্যা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাত যখন তার টার্গেট সেটআপ করে তখন অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলো আবিষ্কার করে সেগুলো নিজেদের পরিকল্পনায় রাখে না। রেললাইন, নদীতীর এবং মহাসড়কের পাশে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে কমপক্ষে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।’ তবে দেশের যে এলাকাগুলোয় নতুন ব্রডগেজ রেললাইন তৈরি করা হয়েছে, সেখানে রেললাইনের মাঝখানে সোলার প্যানেল লাগানো উচিত বলে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *